“দূর্গাপূজা উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে ভারতের বাজারে ১,২০০ টন হিলসা রফতানি অনুমোদন — হিলসা কূটনীতির নতুন অধ্যায়।”
“হিলসা কূটনীতি”: দূর্য প্রাক্কালে ১,২০০ টন হিলসা রফতানির অনুমোদন
ভূমিকা
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে হিলসা কূটনীতি একটি বহুল আলোচিত বিষয়। প্রতিবছর দুর্গাপূজার প্রাক্কালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জন্য বাংলাদেশ সরকার হিলসা রপ্তানির বিশেষ অনুমতি দিয়ে থাকে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। মোহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভারতের জন্য ১,২০০ টন হিলসা রফতানির অনুমোদন দিয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত কেবল অর্থনৈতিক প্রভাবই ফেলছে না, বরং দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ককেও আরও দৃঢ় করছে।
হিলসা কূটনীতির উৎপত্তি
বাংলাদেশের জাতীয় মাছ হিলসা শুধু একটি সুস্বাদু খাদ্য নয়, বরং এটি দুই বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
শেখ হাসিনার আমলে প্রথমবার হিলসা রপ্তানি কূটনৈতিক টুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
দুর্গাপূজার সময় পশ্চিমবঙ্গের বাজারে হিলসা পাঠানোকে “গুডউইল জেসচার” হিসেবে দেখা হয়।
ফলে দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বন্ধনও মজবুত হয়।
এবারের রফতানির মূল বৈশিষ্ট্য
১. পরিমাণ: ১,২০০ টন হিলসা মাছ রপ্তানির অনুমোদন।
২. সময়কাল: দুর্গাপূজার আগে রফতানি সম্পন্ন করতে হবে।
৩. লক্ষ্য বাজার: মূলত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য।
৪. কূটনৈতিক বার্তা: বাংলাদেশের শুভেচ্ছা ও বন্ধুত্বের প্রতীক।
বাংলাদেশের হিলসা উৎপাদন ও বাজার
বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বড় হিলসা উৎপাদনকারী দেশ। নদী, মোহনা ও উপকূলীয় এলাকায় প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ জেলে হিলসা আহরণে যুক্ত থাকেন।
প্রতিবছর বাংলাদেশে প্রায় ৫ লাখ মেট্রিক টনের বেশি হিলসা আহরণ করা হয়।
এর মধ্যে অধিকাংশই স্থানীয় বাজারে ব্যবহৃত হয়।
ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও খুলনা হিলসার প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র।
সরকার জেলেদের সুরক্ষার জন্য নির্দিষ্ট সময়ে হিলসা আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে, যাতে প্রজনন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে।
ভারতের বাজারে হিলসার চাহিদা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে হিলসা মাছের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। দুর্গাপূজা বা বিশেষ উৎসবে হিলসা খাওয়া একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হিলসার মান বাংলাদেশের তুলনায় কম।
ফলে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের হিলসার আলাদা কদর রয়েছে।
উৎসব মৌসুমে এক কেজি হিলসার দাম অনেক সময় ১,৫০০ টাকা থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়।
এ কারণেই হিলসা রপ্তানি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং আবেগের বিষয়ও হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব
বাংলাদেশের মৎস্য খাত দেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।
রপ্তানি আয় বৃদ্ধি: হিলসা রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়।
জেলেদের আয়ের সুযোগ: হিলসার আন্তর্জাতিক বাজার শক্তিশালী হলে জেলেদের জীবনমান উন্নত হয়।
ব্র্যান্ডিং সুযোগ: হিলসা আন্তর্জাতিকভাবে “বাংলাদেশি ইলিশ” নামে পরিচিত হচ্ছে।
তবে দেশীয় বাজারে দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
কূটনৈতিক তাৎপর্য
“হিলসা কূটনীতি” আসলে শুধু মাছের বাণিজ্য নয়, বরং একটি সফট পাওয়ার কৌশল।
ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার করা।
জনগণের আবেগকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো।
বাংলাদেশকে উদার, সহানুভূতিশীল এবং সাংস্কৃতিকভাবে নিকটবর্তী দেশ হিসেবে তুলে ধরা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হিলসা কূটনীতি রাজনৈতিক টানাপোড়েন কমাতে কার্যকর হতে পারে।
রপ্তানির ইতিহাস
বাংলাদেশ প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণ হিলসা রপ্তানি করেছে।
২০১২ সালে প্রায় ৫০০ টন।
২০১৭ সালে ১,২০০ টন।
২০২১ সালে ২,০০০ টনের বেশি।
প্রতিবারই দুর্গাপূজার সময় হিলসা রপ্তানি রাজনৈতিক বার্তা বহন করেছে।
সমালোচনা ও বিতর্ক
যদিও অনেকেই হিলসা কূটনীতিকে ইতিবাচক মনে করেন, সমালোচনা কম নয়।
দেশীয় বাজারে প্রভাব: রপ্তানি হলে দাম বেড়ে যায়, সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাজনৈতিক প্রশ্ন: বিরোধীরা দাবি করে কূটনীতির নামে জনগণের স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে।
কালোবাজার: সঠিক নজরদারি না থাকলে রপ্তানির নামে অবৈধ পাচার বাড়তে পারে
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
হিলসা কূটনীতি ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।
শুধু ভারত নয়, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপেও বাংলাদেশি হিলসার চাহিদা বাড়ছে।
সাংস্কৃতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে হিলসা রপ্তানি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সফট পাওয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে।
যদি টেকসইভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়, তবে হিলসা বাংলাদেশের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হয়ে উঠবে।
জেলেদের অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশের নদীবেষ্টিত অঞ্চলের হাজার হাজার জেলে হিলসার ওপর নির্ভরশীল।
মৌসুমি আহরণে তাদের আয় বাড়ে।
তবে অতিরিক্ত রপ্তানির কারণে অনেক সময় দেশীয় বাজারে তাদের পরিবার হিলসা কিনতে পারে না।
সরকার যদি সঠিক সহায়তা ও ভর্তুকি প্রদান করে, তবে জেলেরা আরও উপকৃত হবে।
উপসংহার
“হিলসা কূটনীতি” এখন শুধু একটি প্রথা নয়, বরং বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মোহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাম্প্রতিক ১,২০০ টন হিলসা রফতানির সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন দুই দেশের সম্পর্ককে
দৃঢ় করবে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সুযোগও সৃষ্টি করবে।
তবে দেশীয় বাজারে সরবরাহ ও দামের বিষয়টি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে কেবল তখনই এই কূটনীতি প্রকৃত অর্থে সফল হবে।
Click here to read the details and updated finance news of all the articles of the article:
https://timesofindia.indiatimes.com/city/kolkata/hilsa-diplomacy-back-on-plate-bdesh-clears-1200-tonnes-ahead-of-durga-puja/articleshow/123772308.cms?utm_source=chatgpt.com
.png)
Post a Comment