প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, সকাল ৯টা
সম্ভবের তিন প্রতিষ্ঠাতা—প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রিফাদ হোসেন, প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) নাকিব মোহাম্মদ ফাইয়াজ এবং প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) হাসিবুর রহমান।
ছবি: সম্ভবের সৌজন্যে
বাংলাদেশে পড়াশোনা শেষ করার পরও বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী বেকারত্বের শিকার হচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে মোট বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা ৮ লাখ ৮৫ হাজার, অর্থাৎ প্রতি তিনজন বেকারের একজনই স্নাতক ডিগ্রিধারী। ফলে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যেই বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি।
চিকিৎসক বা প্রকৌশলীদের তুলনামূলকভাবে চাকরির সুযোগ কিছুটা বেশি থাকলেও ড্রাইভার, রেস্টুরেন্ট কর্মী, ডাটা এন্ট্রির মতো ব্লু-কলার ও সিলভার-কলার পেশাজীবীদের জন্য চাকরি পাওয়া সহজ নয়। এর বড় কারণ হলো যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির সীমিত প্রাপ্যতা এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগের অভাব।
এই বাস্তবতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ২০২২ সালে তিন তরুণ উদ্যোগ নেন একটি চাকরি সহায়ক স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠার। তারা এর নাম দেন ‘সম্ভব’। সম্প্রতি এই স্টার্টআপটি জায়গা করে নিয়েছে মর্যাদাপূর্ণ ‘ফোর্বস এশিয়া ১০০ টু ওয়াচ ২০২৫’ তালিকায়।
সম্ভব অ্যাপটি মূলত মেশিন লার্নিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব প্রযুক্তিগত দক্ষতায় তৈরি এই অ্যাপটি গুগল প্লে স্টোর থেকে ইতোমধ্যে ২০ লাখেরও বেশি বার ডাউনলোড হয়েছে। অ্যাপটির মাধ্যমে এখন পর্যন্ত জমা পড়েছে ৬০ লাখের বেশি আবেদন, যেখানে প্রতি মাসে প্রায় ৩ লাখ চাকরিপ্রার্থী নিয়মিতভাবে এটি ব্যবহার করছেন। এরই মধ্যে সম্ভবের মাধ্যমে চাকরি পেয়েছেন ৩০ হাজারেরও বেশি প্রার্থী, যাঁদের মধ্যে প্রায় ১০ হাজার নারী। বর্তমানে ফুডপান্ডা, পাঠাও, বার্জার, সিঙ্গার, কেএফসি, এসএসএল সিকিউরিটিসহ দুই হাজারেরও বেশি প্রতিষ্ঠান সম্ভবের সেবা গ্রহণ করছে।
আমরা ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের জনবল রপ্তানি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। আগামী বছর থেকে দুইটি দেশে আমাদের কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ শুরু হবে। আমরা বিদেশে কর্মী প্রেরণের পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যয় সাশ্রয়ী করার লক্ষ্য রাখছি। আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশের ৬৪টি জেলায় আমাদের সেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
— রিফাদ হোসেন, প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও, সম্ভব
নিবন্ধিত চাকরিপ্রার্থী এখন ১৮ লাখ
সম্ভবের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও রিফাদ হোসেন ২০১৫ সালে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করেন। সাত বছরের বহুজাতিক কোম্পানি অভিজ্ঞতার পরে ২০২২ সালে ঢাকার বারিধারার ১৫০ বর্গফুটের রুমে ‘সম্ভব’ শুরু হয়। তার সঙ্গে যোগ দেন সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিটিও নাকিব মোহাম্মদ ফাইয়াজ এবং সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিওও হাসিবুর রহমান।
শুরুতে ৩ লাখ ডলার বিনিয়োগ পান গেটস ফাউন্ডেশন থেকে, শর্ত ছিল ২০২৫ সালের মধ্যে ১০ হাজার নারীকে চাকরি দেওয়া। শুরুতে মাত্র ১০০ জন ব্যবহারকারী থাকলেও বর্তমানে সম্ভবে নিবন্ধিত চাকরিপ্রার্থী সংখ্যা ১৮ লাখে পৌঁছেছে। চলতি বছরের মে মাসে সিঙ্গাপুরভিত্তিক কুকুন ক্যাপিটালের নেতৃত্বে প্রি-সিড রাউন্ডে ১০ লাখ ডলার এবং দুটি ইউরোপীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল থেকে ৭ লাখ ডলার বিনিয়োগ আসে। মোট বিদেশি বিনিয়োগ ২০ লাখ ডলার।
রিফাদ হোসেন জানান, দেশের প্রায় সাত লাখ প্রতিষ্ঠান দক্ষ জনবল খুঁজতে সমস্যায় পড়ে। জটিল প্রক্রিয়া ও কাগজপত্রের কারণে প্রতিভা ঠিক জায়গায় পৌঁছায় না। সম্ভব এই সমস্যা সমাধান করতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে চাকরিপ্রার্থীর ৭০ শতাংশই ঢাকা কেন্দ্রীক, বাকি ৩০ শতাংশ খুলনা, চট্টগ্রাম ও কুষ্টিয়ায়।
সম্ভবের সেবা
সম্ভব মূলত B2B মডেলে কাজ করে। এটি জনবল নিয়োগ, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রার্থীর দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা দেয়। ব্যবহারকারী বিনামূল্যে ডিজিটাল প্রফেশনাল প্রোফাইল তৈরি করতে পারে, আবেদন করতে পারে এবং কোনো কারণে চাকরি না হলে সেই তথ্য জানতে পারে। প্রার্থীরা বিভিন্ন বিনামূল্য কোর্সের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়াতে পারে এবং সনদ পায়।
প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভব ব্যবহার করে তাদের জনবল নিয়োগ করে, বিজ্ঞাপন দেয় এবং পে-রোল সুবিধা গ্রহণ করতে পারে। সম্ভব মাসে ৬০০০ টাকা ফি নেয় এবং চাকরি হলে কর্মীর প্রথম মাসের বেতনের ৮০–১০০ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ করে।
রিফাদ হোসেন আরও জানান, ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জনবল রপ্তানি এবং দেশের ৬৪টি জেলায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্ভব: এক স্টার্টআপ যা চাকরি ও মানবসম্পদ প্রযুক্তি বদলে দিচ্ছে
“সম্ভব” স্টার্টআপটি শুরু হয় তিন উদ্যোক্তা দিয়ে, বর্তমানে ৫২ জন কর্মী ঢাকার বারিধারার ৪,০০০ বর্গফুট অফিসে কাজ করছে। ২০২২ সালে গেটস ফাউন্ডেশন থেকে ৩ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, শর্ত ছিল ২০২৫ সালের মধ্যে ১০ হাজার নারীকে চাকরি দেওয়া। প্রথম তিন মাসে অ্যাপে মাত্র ১০০ জন ব্যবহারকারী থাকলেও, এখন ১৮ লাখ নিবন্ধিত চাকরিপ্রার্থী আছে।
সরাসরি প্রযুক্তিতে তৈরি সম্ভব অ্যাপে চলতি বছরের মে মাসে সিঙ্গাপুরভিত্তিক কুকুন ক্যাপিটালের নেতৃত্বে ১ মিলিয়ন ডলার প্রি-সিড ফান্ডিং এসেছে, এবং দুটি ইউরোপীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল থেকে ৭ লাখ ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। সব মিলিয়ে ২০ লাখ ডলার বিদেশি বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে স্টার্টআপটি। গত ছয় মাস ধরে তারা মুনাফায় রয়েছে।
প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও রিফাদ হোসেন বলেন, “দেশের প্রায় সাত লাখ প্রতিষ্ঠান উপযুক্ত কর্মী খুঁজে দারুন কষ্ট পায়। কাগজপত্র ও জটিল নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণে উৎপাদনশীলতা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। তাই আমরা নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সহজ এবং ব্যয় ও সময় সাশ্রয়ী করতে এই প্ল্যাটফর্ম চালু করেছি।”
সম্ভবের সেবা:
বিজনেস টু বিজনেস (B2B) জব-টেক ও এইচআর-টেক প্ল্যাটফর্ম।
চাকরিপ্রার্থী বিনামূল্যে ডিজিটাল প্রফেশনাল প্রোফাইল তৈরি এবং আবেদন।
দক্ষতা বাড়ানোর জন্য বিনামূল্যে কোর্স ও সনদ প্রদান।
প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রার্থী মূল্যায়ন, নিয়োগ ও পে-রোল সুবিধা।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ প্রজেক্ট।
সংস্থাটি মাসে প্রতিষ্ঠান থেকে ৬,০০০ টাকা এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথম মাসের বেতনের ৮০–১০০ শতাংশ চার্জ করে। প্রতি কর্মীর জন্য ৮০০–১,২০০ টাকা পর্যন্ত চার্জ ধার্য করা হয়।
ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশে জনবল রপ্তানি এবং দেশের ৬৪ জেলায় সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
গেটস ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উৎস থেকে মোট ২০ লাখ ডলার তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছে।
আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশের ৬৪টি জেলায় তাদের সেবা বিস্তারের লক্ষ্য রয়েছে।
সম্ভব: বাংলাদেশের স্টার্টআপ যা চাকরি ও মানবসম্পদ সেবা সহজ করছে
সম্ভবের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও রিফাদ হোসেন প্রথম আলোকে জানান, “দেশের প্রায় সাত লাখ প্রতিষ্ঠান কর্মী খুঁজতে হিমশিম খায়। জটিল কাগজপত্র ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় সঠিক প্রতিভা সঠিক স্থানে পৌঁছায় না। ফলে উৎপাদনশীলতা প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যায় এবং বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থী দালালের আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এই সমস্যা দূর করতে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ ও ব্যয় সাশ্রয়ী করতে আমরা ‘সম্ভব’ চালু করেছি। চাকরিপ্রার্থীদের নিবন্ধন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। বর্তমানে সম্ভবে নিবন্ধিত প্রার্থীর ৭০ শতাংশই ঢাকা, বাকি ৩০ শতাংশ খুলনা, চট্টগ্রাম ও কুষ্টিয়া কেন্দ্রিক।”
সেবা ও সুবিধা
সম্ভব মূলত বিজনেস-টু-বিজনেস (B2B) মডেলে কাজ করে। এটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জনবল নিয়োগ, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রার্থী মূল্যায়নের সুবিধা দেয়। চাকরিপ্রার্থীরা চাইলে ডিজিটাল প্রফেশনাল প্রোফাইল তৈরি করতে পারেন এবং বিনামূল্যে আবেদন করতে পারেন। যদি চাকরি না হয়, প্রতিষ্ঠান কারণ জানায়। প্রয়োজন অনুযায়ী বিনা খরচে দক্ষতা উন্নয়নের জন্য কোর্স এবং কোর্স শেষে সনদও দেয়া হয়।
প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনবল নিয়োগে সহায়তার জন্য সম্ভব মাসিক ৬,০০০ টাকা চার্জ করে। চাকরি প্রাপ্ত প্রার্থীর প্রথম মাসের বেতন অনুযায়ী ৮০–১০০ শতাংশ পর্যন্ত ফি নেয়। এছাড়াও, সম্ভব পে-রোল সুবিধার মাধ্যমে ৮০০–১,২০০ টাকা পর্যন্ত চার্জ করে। প্রতিষ্ঠানটি গেটস ফাউন্ডেশন, ইউনিসেফ, সুইসকন্ট্যাক্ট এবং রুটস অব ইমপ্যাক্টসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে।
রিফাদ হোসেন জানান, “ভবিষ্যতে আমরা মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশে দেশের জনবল রপ্তানি শুরু করতে যাচ্ছি। প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যয়সাশ্রয়ী করতে চাই। আগামী তিন বছরে দেশের ৬৪টি জেলায় আমাদের সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।”

Post a Comment